বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ১৫০টি আসনে উপযুক্ত প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। দলটির অভ্যন্তরীণ জরিপ ও তৃণমূল নেতাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা গেছে, এসব আসনে যোগ্য, জনপ্রিয় ও জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাময় প্রার্থী খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
দলটির একাধিক সিনিয়র নেতা জানিয়েছেন, বাকি ১৫০ আসনে তুলনামূলকভাবে প্রার্থী সংকট নেই, সেসব আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা প্রায় সম্পন্ন। তবে চিহ্নিত ১৫০ আসনে প্রার্থী বাছাই এখন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক শীর্ষ নেতা বলেন,
“এই আসনগুলোতে প্রার্থীর যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সংগঠনিক শক্তি—সব দিক থেকেই ঘাটতি আছে। যদি এখানে ভুল প্রার্থী বাছাই করা হয়, প্রতিদ্বন্দ্বীরা সেই সুযোগ নেবে, যা দলের জন্য ক্ষতিকর হবে।”
🔹 প্রার্থী সংকটের কারণ
মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নেতারা জানিয়েছেন, প্রার্থী সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মৃত্যু বা দীর্ঘ অনুপস্থিতি
স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা হ্রাস
বয়সজনিত সমস্যা
একাধিক প্রার্থী নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য জানান, এসব আসনে ১০০ জনেরও বেশি নতুন মুখ বিবেচনায় আনা হচ্ছে। নতুনদের মধ্যে যাচাই করা হচ্ছে সততা, ত্যাগ, তৃণমূলের গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ভিত্তিতে।
🔹 আন্দোলনে সক্রিয়দের অগ্রাধিকার
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষ ও পরবর্তী আন্দোলনে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তারেক রহমান ও তার টিম প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে পাঁচটি অভ্যন্তরীণ জরিপ সম্পন্ন হয়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, বিএনপি যেসব আসনে নিজেদের শক্ত অবস্থানে মনে করছে, সেই ১৫০ আসনে তারেক রহমান প্রার্থী চূড়ান্ত করেছেন, যাদের অধিকাংশ ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
🔹 মনোনয়ন বৈঠক ও ঐক্যের প্রচেষ্টা
২০ সেপ্টেম্বর থেকে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা শত শত মনোনয়নপ্রত্যাশীর সঙ্গে বৈঠক করছেন। উদ্দেশ্য—দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এড়ানো ও ঐক্য নিশ্চিত করা।
যেসব আসনে প্রার্থী বেশি, সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের, আর সাংগঠনিক সম্পাদকরা দিচ্ছেন সহায়তা। তারেক রহমান ভিডিও কলে সরাসরি প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন,
“১০০ থেকে ১২০টি আসনে তিন-চারজন করে শক্তিশালী প্রার্থী মনোনয়ন চাইছেন। দল এখন থেকেই আলোচনায় বসছে, যাতে পরে মনোনয়ন নিয়ে বিভাজন না ঘটে।”
🔹 প্রার্থীদের প্রতিক্রিয়া
মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বলছেন, তারা দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন।
চাঁদপুর বিএনপির সহ-সভাপতি এম এ শুক্কুর পাটোয়ারী বলেন,
“আমাদের বলা হয়েছে, যাকে মনোনীত করবে, তাকেই সমর্থন করতে হবে। দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।”
অন্যদিকে বরিশাল-৫ আসনের প্রার্থীপ্রত্যাশী মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ বলেন,
“আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাব না।”
তবে একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
“যদি ভুল ব্যক্তি মনোনীত হন, তৃণমূল কর্মীরা তাকে সমর্থন করবে না।”
🔹 জোট রাজনীতি ও আসন ভাগাভাগি
বিএনপি ইতোমধ্যে তাদের মিত্র দলগুলোকে প্রার্থী তালিকা জমা দিতে বলেছে।
আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ১২-দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির বিষয়ে আলোচনা চলছে।
তিন দিন আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জোটের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রার্থী তালিকা চেয়েছেন।
১২-দলীয় জোটের মুখপাত্র শহীদুল হোসেন বলেন,
“দু-এক দিনের মধ্যেই আমাদের তালিকা বিএনপিকে দেওয়া হবে।”
এছাড়া বিএনপি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কয়েকটি ইসলামী ও বামঘেঁষা সংগঠনের সঙ্গেও আলোচনা করছে।
🔹 নতুন আইনের কারণে বাড়তি সতর্কতা
দলীয় সূত্র জানায়, এবার আসন ভাগাভাগিতে বিএনপি অনেক বেশি সতর্ক। কারণ, সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী অন্য দলের প্রতীক—যেমন ধানের শীষ—ব্যবহার করতে পারবেন না।
এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন,
“আমরা জানি, অনেক জোটসঙ্গী দলের তৃণমূলে প্রভাব নেই। তারপরও পূর্ণাঙ্গ তালিকা চাইছি, যাতে ঐক্যের ভাঙন ঠেকানো যায় এবং আলোচনায় নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।”
ডেইলি কলমকথার সকল নিউজ সবার আগে পেতে গুগল নিউজ ফিড ফলো করুন
দৈনিক কলম কথা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।